আমাদের সম্পর্কে

বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির চুড়ান্ত বিকাশের এই  সময়ের ,স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের স্বর্ণযুগে এসেও  বিশ্বব্যাপী বেতার বা রেডিও’র জনপ্রিয়তা আজও খুব একটা কমেনি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আজও এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ বেতার’ এর পাশাপাশি,দেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি এফএম (ফ্রিকোয়েন্সি মড্যুলেশন) বেতার কেন্দ্র  চালু রয়েছে। নগরকেন্দ্রীয় এসব রেডিও চ্যানেল সাধারণত বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। কিন্তু একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত কোনো বেতার  বাংলাদেশে না থাকায়, গ্রামীন জনগোষ্ঠীর মতামত প্রকাশের অধিকার প্রয়োগের জায়গায় তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও’র যাত্রা শুরু হয়।  এখন গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে পরিচালিত হচ্ছে কমিউনিটি রেডিও। এখানে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটচ্ছে।

কমিউনিটি রেডিও কী

কমিউনিটি রেডিও হচ্ছে একটি আঞ্চলিক জনসেবামূলক সম্প্রচার মাধ্যম যা কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত,তাদের অংশগ্রহণে পরিচালিত এবং তাদেরই কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। স্বল্প পরিসরে এর সম্প্র্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নিদিষ্ট এলাকায় বাইরে এ রেডিও শোনা যায় না।

কমিউনিটি রেডিও এমন একটি মাধ্যম যা তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের আতœপ্রকাশ ও বিকাশের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে এবং প্রান্তিক মানুষের মতামত প্রকাশের বাহন ও তাদের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসাবে কাজ করে । সর্বোপরি এটি সমাজের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে জোরদার করে। কমিউনিটি রেডিও একটি কমিউনিটির নিজস্ব সম্পদ।

কমিউনিটি রেডিও কেন

কমিউনিটি রেডিও’র মুল উদ্দেশ্য হলো তথ্যে তৃণমূল মানুষের প্রবেশাধিকারের সুযোগ সৃষ্টি করা। পাশাপাশি, সম্প্রচার মাধ্যমে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির সংরক্ষণ,উন্নয়ন এবং তাদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন-বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেয়া।

কমিউনিটি রেডিও’র অনুষ্ঠান

কমিউনিটি রেডিও মূলত একটি উন্নয়নভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম। আর তাই এ রেডিও’র অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সুবিধা,সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়। তৃণমূল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয়া হয়। যেমন কৃষি,স্বাস্থ্য,শিক্ষা,পরিবেশ,দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো,শিশু ও নারী কল্যাণ ইত্যাদি। পাশাপাশি, বিনোদন, স্থানীয় বাজার দর, সরকারি ও বেসরকারি সেবা বিষয়ক তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়। আর এসব অনুষ্ঠান তৈরি করা হয় ্ওই জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষায় বা তাদের বোঝার মতো সহজ ভাষায়।

আরডিআরএস ও কমিউনিটি রেডিও

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা লুথেরান ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন (এলডব্লিউএফ) এর সহযোগিতায় ১৯৭২ সালে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে কাজ শুরু করে। এ অঞ্চলের বিশেষ করে গ্রামীন জনপদের দরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক-সাস্কৃতিক জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আরডিআরএস শুরু থেকেই পরিচালনা করছে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকান্ড। এই সংস্থার সকল কর্মকান্ডে পশ্চাৎপদ কমিউনিটির মানুষ। তাই কমিউনিটির সার্বিক উন্নয়নে সহযোগী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আরডিআরএস বাংলাদেশ কমিউনিটি রেডিও প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহন এবং সরকারি অনুমোদনের জন্য আবেদন করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে অন্য আরো ১১ টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরডিআরএস বাংলাদেশ কমিউনিটি রেডিও পরিচালনার জন্য সরকারি অনুমোদন লাভ করে।

রেডিও চিলমারী

কুড়িগ্রাম জেলার নদীবেষ্টিত উপজেলা আব্বাস উদ্দিন আহমদের সেই বিখ্যাত গান “ওকি গাড়িয়াল ভাই হাকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে” চিলমারী উপজেলার  রমনা ইউনিয়নে আরডিআরএস বাংলাদেশ পরিচালিত রেডিও চিলমারী এফএম ৯৯.২ অবস্থিত।  রেডিও চিলমারী এফএম ৯৯.২০ মেগাহার্টজ “শোন বাহে জাগো বাহে” শ্লোগান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১২ সালের ২ জুন। শহর ও গ্রামের তথ্য বিভাজন কমাতে কাজ করে চলেছে রেডিও চিলমারী। গ্রামীণ প্রান্তীয় জনগোষ্ঠির, কণ্ঠহীনের কণ্ঠস্বর হিসাবে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে রেডিও চিলমারী। রেডিও চিলমারী বর্তমানে বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা প্রর্যন্ত অনুষ্ঠান প্রচার করছে।  রেডিও চিলমারী থেকে  প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা শোনা যায় কেন্দ্র থেকে ১৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে।

 

রেডিও চিলমারী  নিয়মিত অনুষ্ঠানমালায় যা যা থাকছে

  • নারীর কথা ঃ নারী ও শিশু বিষয়ক একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে নারীর অধিকার, নারীর বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও সমাধান উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।
  • সুস্থ দেহ সুস্থ মন ঃ স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি শিশু, গর্ভবতী, নারী ও পুরুষ সকলকে স্বাস্থ্য সচেতন করার লক্ষ্যে প্রচারিত হয়।
  • কৃষি আরো বেশিঃ একটি কৃষি ভিত্তিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানটি স্থানীয় কৃষক ও কৃষির উপর গুরুত্ব দিয়ে নির্মাণ ও প্রচার করা হয়। এই অনুষ্ঠানে কৃষি পরামর্শ, সমস্যা সমাধান ও নতুন নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
  • আইনের কথাঃ স্থানীয় জনসাধারণকে আইন বিষয়ে সচেতন করার জন্য অনুষ্ঠানটি প্রচার করা হয়।
  • উন্নয়ন সংবাদ ঃ স্থানীয় উন্নয়নমুলক খবরাখবর ও আবহাওয়া বার্তা প্রচার করা হয়।
  • সাফল্য গাথা ঃ স্থানীয় কমিউনিটির যারা প্রতিকুল অবস্থান থেকে বিভিন্নভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন তাঁদের নিয়ে এই অনুষ্ঠান।
  • দূর্যোগ ও পরিবেশঃ এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বন্যা, খরা, ঘুর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিরাপদ থাকা এবং দূর্যোগকালিন ও পরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা হয়। একই শিরোনামে আরো একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। যে অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।  ­­­­­­­­­­­
  • আলো আমার আলোঃ একটি শিক্ষা বিষয়ক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য  শিক্ষা, শিক্ষার মান, শিক্ষার গুরুত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করা হয়।
  • সৃষ্টি সুখের উল্লাসেঃ শিশুদের নিয়ে সাজানো একটি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি স্কুল ভিত্তিক। শিশুর মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রচার করা হয়।
  • বাজার দরঃ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রতিদিনের বাজার মূল্য। অনুষ্ঠানটি স্থানীয় জনগণকে বাজার মুল্য যাচাই করতে সহায়তা করে।
  • যোগাযোগঃ এই অনুষ্ঠানটিতে বাস, নৌকা ও ট্রেনের সময় সূচি জানানো হয়।
  • জনতার কথাঃ বিভিন্ন সময় জনসাধারণের মতামত তুলে ধরা হয়।
  • কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যশিক্ষা: এর মধ্যে রয়েছে প্রজনন স্বাস্থ্য,সাধারণ স্বাস্থ্যজ্ঞান ইত্যাদি।
  • মাতৃস্বাস্থ্য: গর্ভবতী মায়েদের জন্য পরামর্শমূলক অনুষ্ঠান, মায়েদের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি।
  • বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান: গান, নাটক, বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান।

 

এছাড়াও রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের সেবাসমূহের তথ্য এবং বিনোদনমূলক গান,নাটক,কথিকা,সাক্ষাৎকার ও পরামর্শধর্মী বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিমূলক অনুষ্ঠান। রেডিওতে প্রচারের জন্য অনুষ্ঠানমালা নির্মানের ক্ষেত্রে এলাকার সহজ সরল কথ্য ভাষাকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হয়। এই রেডিও’র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরাও মূলত এলাকারই জনগণ। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংবাদ ও জাতীয় অনুষ্ঠান বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে রীলে এবং বাংলাদেশ বেতার ও সরকারের অন্যান্য দপ্তর হতে প্রেরিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার  করা হয়। তবে যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ক্ষেত্রে রেডিও চিলমারী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রণীত নীতিমালা অনুসরণ করে।

কমিউনিটি রেডিও নিয়ে আরডিআরএস-এর ভাবনা

আরডিআরএস বাংলাদেশ-এর প্রধান লক্ষ্য তৃণমূল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক জীবনমান উন্নয়ন এবং নারী ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা করা। আরডিআরএস-এর এই লক্ষ্য অর্জনের পথে কমিউনিটি রেডিও চিলমারী এক শক্তিশালী মাধ্যম। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের লোকজ সংস্কৃতি ধরে রাখার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সর্বোপরি আরডিআরএস মনে করে, কমিউনিটি রেডিও’র মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবেন। সচেতন হবেন বিভিন্ন বিষয়ে এবং সক্ষম হবেন নতুন নতুন ধারণার সম্মিলন ঘটাতে। নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে এক সময় তারা নিজেরাই নিজেদের জীবনমান উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রেডিও চিলমারী এগিয়ে যাচ্ছে আগামীর পথে.............